চোখের জলে মওলানা তৈয়ীবুর রহমানকে চিরবিদায় জানাল আসাম
প্রকাশিত হয়েছে : ১২:২২:৪৬,অপরাহ্ন ০১ মার্চ ২০১৯ | সংবাদটি ৮১৪ বার পঠিত
তাজ উদ্দিন : হাইলাকান্দি (আসাম) : উত্তর-পূর্ব ভারতের মুসলমানদের ধর্মীয় অভিভাবক হিসেবেই পরিচিত আমিরে শরিয়ত আল্লামা তৈয়ীবুর রহমান বড়ভুঁইয়া আর নেই। বুধবার ২৭ ফেব্রুয়ারি দুপুর ১২টা ৫মিনিটে তিনি শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন। ইন্না লিল্লাহি ওয়া ইন্না ইলাইহি রাজিউন। বর্ণময় জীবনে অনেক স্মৃতি রেখে যাওয়া আল্লাহর অতি প্রিয় বান্দা তৈয়ীবুর রহমানের জানাজার নামাজ বৃহস্পতিবার সকালে হাইলাকান্দি শহরের নিকটবর্তী তাঁর পৈতৃক গ্রাম রাঙাউটিতে অনুষ্ঠিত হয়। এতে প্রায় চার লক্ষ লোক অংশগ্রহণ করেন। এদিন সকাল থেকে হাজার হাজার গাড়ি শোকার্ত লোকদের নিয়ে রাঙাউটির দিকে ছুটতে থাকে। এর ফলে নজিরবিহীন যানজটের সৃষ্টি হয়। এজন্য কয়েক হাজার লোক জানাজার নামাজে অংশ নিতে পারেননি। তবুও মরহুম তৈয়বুর রহমানের জানাজার নামাজে উপস্থিতির সংখ্যা আসামে বরাক উপত্যকায় এক নতুন রেকর্ড সৃষ্টি করেছে বলা যায়। অলৌকিক বিষয় হল, জানাজার সময় আকাশে কয়েকশো ছোট ছোট পাখিকে উড়তে দেখা যায়। জানাজার নামাজ শেষ হতেই পাখিগুলিও চলে যায়!

মরহুম তৈয়ীবুর রহমান বড়ভুঁইয়া এতদঞ্চলের অন্যতম ধর্মীয় সংগঠন উত্তর-পূর্ব ভারত এমারতে শরয়ীয়াহ ও নদওয়াতুত তামীরের প্রধান পদে আসীন ছিলেন। এছাড়া তিনি অল ইন্ডিয়া মুসলিম পার্সোনাল ল বোর্ডের সদস্য ছিলেন।
১৯৩১ সালের ২৬ জুন মওলানা তৈয়ীবুর রহমানের জন্ম হয়। আসাম রাজ্য মাদ্রাসা বোর্ডের অধীনে এম এম পরীক্ষায় তিনি প্রথম শ্রেণিতে প্রথম স্থান লাভ করেন। পরে তিনি ১৯৭১ সালে গৌহাটি বিশ্ববিদ্যালয় থেকে আরবিতে স্বর্ণপদক সহ এম এ পাশ করেন। এছাড়া ভারতের রাষ্ট্রভাষা প্রচার সমিতির অধীনে হিন্দি শিক্ষার বিশেষ পাঠ্যক্রমেও উত্তীর্ণ হন তিনি। ছাত্র জীবনে কংগ্রেস এবং জমিয়ত উলামায়ে হিন্দের কর্মী হিসেবে ভারতের স্বাধীনতা আন্দোলনে অংশ নেন মওলানা তৈয়ীবুর রহমান বড়ভুঁইয়া।
১৯৫৭ সালে হাইলাকান্দি সিনিয়র মাদ্রাসায় হিন্দি শিক্ষক হিসেবে যোগদান করেন। পরবর্তী সময়ে সহকারী শিক্ষক এবং এরপর মাদ্রাসার অধ্যক্ষ হিসেবেও দীর্ঘদিন দায়িত্ব পালন করে ১৯৯৬ সালে অবসর গ্রহণ করেন। তবে সরকারিভাবে অবসর গ্রহণের পরও শিক্ষকতা চালিয়ে যান তিনি। কাছাড় টাইটেল মাদ্রাসায় শেয়খুল হাদিস হিসেবে পাঠদান করতেন তিনি। হাইলাকান্দির এস এস কলেজেও আরবি বিষয়ে খণ্ডকালীন শিক্ষকতা করেছেন। দেওরাইল টাইটেল মাদ্রাসায়ও কিছুদিন পাঠদান করেছেন তিনি।
ধর্মীয় সংগঠন নদওয়াতুত তামীরে তিনি প্রথমদিকে সাধারণ সম্পাদক ছিলেন। ১৯৮৯ সালে তদানীন্তন আমিরে শরিয়ত মওলানা আব্দুল জলিল চৌধুরী ইন্তেকাল করলে তৈয়ীবুর রহমানকে আমিরে শরিয়ত মনোনীত করা হয়।
মোট আটবার হজ্ব পালন করেছেন মরহুম তৈয়ীবুর রহমান বড়ভুঁইয়া। ১৯৮৩ সালে এম ভি নুরজাহান জাহাজে তিনি আমিরে হজ্বের দায়িত্ব পালন করেন। আসাম মাদ্রাসা একাডেমিক কাউন্সিলের প্রতিষ্ঠাতা চেয়ারম্যান, আসাম মাদ্রাসা শিক্ষক সংস্থার সভাপতি, হাইলাকান্দি জেলার কাজিয়ে শরিয়ত, অল ইন্ডিয়া মিল্লি কাউন্সিলের সদস্য ছিলেন তিনি। শিক্ষকতায় অবদানের জন্য তিনি রাষ্ট্রপতি পুরস্কার (১৯৮৮) লাভ করেন। ২০১৫ সালে আসাম সরকার প্রতিষ্ঠিত মওলানা আহমদ আলি স্মৃতি পুরস্কার প্রথমবার পান মরহুম তৈয়ীবুর রহমান। সেই পুরস্কার ২০১৬ সালের মার্চে তাঁর হাতে তুলে দেন তখনকার মুখ্যমন্ত্রী তরুণ গগৈ। এক সময় হোমিওপ্যাথি চিকিৎসায়ও বেশ নাম যশ কুড়িয়েছিলেন তৈয়ীবুর রহমান বড়ভুঁইয়া।
২০১৬ সালে মেঘালয় রাজ্যের ইউ এস টি এম বিশ্ববিদ্যালয় থেকে তিনি সাম্মানিক ডক্টরেট ডিগ্রি লাভ করেন। ধর্মীয় বিষয়ে তিনি প্রচুর লেখালেখি করেছেন। তাঁর লেখা দুটি বই ‘নুখবাতুল আদব’ এবং ‘তারিখুল উলুমিল আরবিয়া’ আসাম মাদ্রাসা শিক্ষার পাঠ্যক্রমে অন্তর্ভুক্ত সহ বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্তে তাঁর শুভানুধ্যায়ীরা ছড়িয়ে ছিটিয়ে রয়েছেন। তিনি বিভিন্ন সময় বাংলাদেশেও সফর করেছেন।
আল্লামা তৈয়ীবুর রহমান বড়ভুঁইয়ার মৃত্যুতে ভারতের শীর্ষ স্থানীয় ধর্মীয় ও রাজনৈতিক ব্যক্তিত্বরা শোক প্রকাশ করেছেন। এই তালিকায় মওলানা বদরউদ্দিন আজমল, আহমদ সঈদ গোবিন্দপুরী, রাহুল গান্ধী, সর্বানন্দ সনোয়াল, মমতা ব্যানার্জি, চন্দ্রবাবু নাইডু প্রমুখ রয়েছেন।

