মদিনা শরিফের জুমার খুতবা উপকারী কাজে তৎপর হোন
প্রকাশিত হয়েছে : ২:৩৮:০১,অপরাহ্ন ১৮ জানুয়ারি ২০১৯ | সংবাদটি ৪৯৩ বার পঠিত
শায়খ ড. আবদুল বারি সুবাইতি: যা তোমার জন্য উপকারী তা পেতে সচেষ্ট হও। কারণ জীবন তো সীমিত ও সংক্ষিপ্ত। যৌবন শেষে বার্ধক্য চলে আসবে। সুস্থতার হুমকি হয়ে আসবে রোগ-ব্যাধি। আবদুল্লাহ ইবনে মাসউদ (রা.) বলেন, ‘ওই দিনের চেয়ে বেশি আর কোনো বিষয়ে আমার অনুশোচনা নেই যে দিনে সূর্য ডুবে গেল, আর তাতে আমার আয়ু কমে গেল; অথচ সেদিন আমার কোনো আমল বৃদ্ধি পায়নি।’
জীবনে সফলতা অর্জন করা প্রত্যেক মানুষের কাম্য। সুখ লাভ করা মানুষের লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য। মানুষের হৃদয় ও অন্তর এ দুটির দিকেই ধাবিত হয়। নবী করিম (সা.) আমাদের জন্য পৃথিবীতে ও পরকালে সফলতা ও সুখ লাভের জন্য একটি হাদিসের মাধ্যমে ত্রিমাত্রিক পথ অঙ্কন করে দিয়েছেন, হাদিসটি বিশাল উপকারী ও বিরাট লাভজনক। এ হাদিসে তিনি বলেন, ‘যা তোমার উপকারে আসবে তা অর্জনে আগ্রহী হও, আল্লাহর কাছে সাহায্য চাও এবং অক্ষমতা প্রকাশ করো না।’
আপনার জন্য যা কল্যাণকর তাতে মনোনিবেশ করুন। মহৎ লক্ষ্য-উদ্দেশ্য, উন্নত স্বভাব-চরিত্র ও সর্বোত্তম ইবাদত-বন্দেগির জন্য প্রচেষ্টায় আগ্রহী হোন। আপনার জীবনের একটি টার্গেট ও গন্তব্য নির্ধারণ করুন। জীবনের একটি লক্ষ্য স্থির করুন। আপনার পথচলার একটি উচ্চ গন্তব্য নির্দিষ্ট করুন। আল্লাহ বলেন, ‘কোন লোক বেশি সঠিক পথে আছে? যে ব্যক্তি ঝুঁক মুখে ভর দিয়ে চলে, নাকি সেই ব্যক্তি যে সোজা হয়ে সরল পথে চলে?’ (সূরা মুলক : ২২)।
যা তোমার জন্য উপকারী তা পেতে সচেষ্ট হও। কারণ জীবন তো সীমিত ও সংক্ষিপ্ত। যৌবন শেষে বার্ধক্য চলে আসবে। সুস্থতার হুমকি হয়ে আসবে রোগ-ব্যাধি। আবদুল্লাহ ইবনে মাসউদ (রা.) বলেন, ‘ওই দিনের চেয়ে বেশি আর কোনো বিষয়ে আমার অনুশোচনা নেই যে দিনে সূর্য ডুবে গেল, আর তাতে আমার আয়ু কমে গেল; অথচ সেদিন আমার কোনো আমল বৃদ্ধি পায়নি।’ আল্লাহ বলেন, ‘সেই দিন মানুষ উপলব্ধি করবে, তখন এ উপলব্ধি তার কী কাজে আসবে?’ সে বলবে, ‘হায়, আমি যদি আমার এ জীবনের জন্য কিছু অগ্রিম পাঠাতাম!’ (সূরা ফজর : ২৩-২৪)।
কল্যাণকর ও উপকারী কাজে আগ্রহী ব্যক্তি মূল্যবান লাভজনক কাজে ও উত্তম উৎকৃষ্ট বিষয়াদি নিয়ে ব্যস্ত থাকে এবং যেসব আমলে পুণ্য বেশি ও আল্লাহর কাছে বেশি প্রিয় সেসব কাজে নিয়োজিত থাকে। এ জন্য সাহাবায়ে কেরাম সবচেয়ে শ্রেষ্ঠ ও মহান আমলগুলো জানতে চেয়ে প্রশ্ন করতেন। এক বক্তি বলল, ‘হে আল্লাহর রাসুল, ইসলাম কী? তিনি বললেন, আল্লাহর জন্য তোমার হৃদয় একনিষ্ঠ হওয়া। আল্লাহর জন্য তোমার অন্তর নিবেদিত হওয়া। তোমার জিহ্বা ও হাত থেকে অন্য মুসলিমদের নিরাপদ থাকা।’ সে বলল, ‘কোন ইসলাম উত্তম?’ তিনি বললেন, ‘ঈমান’। সে বলল, ঈমান কী? তিনি বললেন, ‘আল্লাহ, তাঁর সব ফেরেশতা, তাঁর সব কিতাব, তাঁর সব রাসুল ও মৃত্যুর পরে পুনরুত্থানের প্রতি বিশ্বাস স্থাপন করবে।’ সে বলল, কোন ঈমান উত্তম? তিনি বলেন, ‘হিজরত’। সে বলল, হিজরত কী? তিনি বললেন, ‘মন্দ কাজ বর্জন করা।’
এরকম উত্তম আমল সম্পর্কে নবী করিম (সা.) আরও বলেন, ‘একা একা নামাজ পড়ার চেয়ে জামাতে নামাজ পড়া ২৭ গুণ বেশি উত্তম।’ অন্য হাদিসে তিনি বলেন, ‘একটি দেরহাম এক লক্ষ্য দেরহামের চেয়ে অগ্রগামী হয়েছে।’
উপকারী কাজে আগ্রহী ব্যক্তি এমন উপকার পেতে তৎপর থাকে যার প্রভাব স্থায়ী হয়, যার পুণ্য পৃথিবীতে অব্যাহত থাকে এবং পরকালের সফলতার দিকে প্রসারিত হয়। আল্লাহ বলেন, ‘তাদের মধ্যে কেউ বলে, হে আমাদের প্রতিপালক! আমাদের দুনিয়ায় কল্যাণ দান করুন এবং আখেরাতেও কল্যাণ দান করুন। আমাদের জাহান্নামের শাস্তি থেকে রক্ষা করুন। তাদের জন্য রয়েছে তাদের উপার্জিত পুণ্যের অংশ। আল্লাহ দ্রুত হিসাবগ্রহণকারী।’ (সূরা বাকারা : ২০১-২০২)। এখানে আয়াতটিতে উভয় ‘হাসানাহ’ দ্বারা উদ্দেশ্য হলো দুনিয়া ও আখেরাতের নেয়ামতরাজি। কল্যাণকর কাজে সচেষ্ট সচেতন ব্যক্তি প্রথমে নিজেকে দিয়েই কাজ শুরু করে, নিজের সংশোধন করে। অর্থহীন অহেতুক যাবতীয় কাজ তার কোনো উপকারে আসবে না। রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেন, ‘ব্যক্তির ইসলামের সৌন্দর্য হচ্ছে সেসব বিষয় বর্জন করা যা তার কোনো উপকারে আসবে না।’ আর যে ব্যক্তি অহেতুক কাজ বর্জন করেছে এবং অর্থবহুল কাজে নিয়োজিত হয়েছে তার ইসলামও সুন্দর হয়েছে, সে তার প্রধান প্রধান কাজের জন্য আন্তরিক হয়েছে। তার আমল নিয়ে উন্নতি সাধন করেছে। নিজেকে, নিজের চরিত্র ও জিহ্বাকে পরিশুদ্ধ করেছে। সে তার নিজের পর্যবেক্ষক হয়েছে। তার আচরণের সে প্রহরী। নিজের সঙ্গে তার আচরণ সত্যনিষ্ঠ ও ন্যায়সঙ্গত। নবী শুয়াইব (আ.) নিজের জাতিকে বলেছিলেন, ‘আমি যেসব বিষয়ে তোমাদের বাধা দান করি আমি নিজে সেগুলো করার ইচ্ছা করি না। আমি তো শুধু যথাসাধ্য সংশোধন চাই। আমি আল্লাহর কাছেই তৌফিক কামনা করি। তাঁর ওপরই ভরসা করি। তাঁর দিকেই মনোনিবেশ করি।’ (সূরা হুদ : ৮৩)।
কল্যাণকর কাজের আগ্রহ শক্তিগুলোকে নির্মাণের দিকে নিয়ে যায়, পৃথিবীর সমৃদ্ধি ঘটায়, জীবনে আনে বরকত। আমলকে করে মজবুত। আল্লাহ বলেন, ‘আর যা মানুষের উপকার করে তা জমিনে বদ্ধমূল হয়ে থাকে।’ (সূরা রাদ : ১৭)।
কল্যাণকর কাজের আগ্রহের জন্য মনের মধ্যে ও ইচ্ছার মধ্যে আচরণগত একটি শক্তি প্রয়োজন। কারণ সব কাম্য বিষয় উপকারী নয় আবার সব অপ্রিয় বিষয় ক্ষতিকর নয়। তাই তো জ্ঞানী লোক অল্প নগদ লাভের চেয়ে তুলনামূলক বেশি বাকি লাভকে প্রাধান্য দিয়ে থাকে। আল্লাহ বলেন, ‘কিছুতেই নয়, বরং তোমরা তো দুনিয়াকে প্রাধান্য দিচ্ছ আর আখেরাতকে ছেড়ে দিচ্ছ।’ (সূরা কিয়ামাহ : ২০-২১)।
উপকারী কাজের আগ্রহের জন্য প্রয়োজন এমন লোকদের সাহচর্য, যারা উপকার করতে পারে। সবাই নিজ নিজ সঙ্গীর অনুসরণ করে থাকে। স্থবির লোকের সান্নিধ্য ও আশাবাদী লোকের সান্নিধ্যের মধ্যে বিস্তর পার্থক্য। রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেন, ‘মানুষ তার সঙ্গীর স্বভাব অনুসরণ করে থাকে। তাই তোমাদের প্রত্যেকের লক্ষ্য রাখা উচিত কাকে সে সঙ্গী বানাচ্ছে। মানুষ ভালো ও উপকারী কাজ করতে যতই আগ্রহী হোক আল্লাহ যদি তাকে সাহায্য না করেন, তৌফিক না দেন এবং সঠিক পথ না দেখান তবে তার কোনো লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য কিছুতেই বাস্তবায়িত হবে না।’ ‘আল্লাহর সাহায্য কামনা করো।’ তিনিই সহায়, সব সৃষ্টি ইচ্ছায় অনিচ্ছায় তাঁর কাছেই আশ্রয় নেয়। কষ্টে-শান্তিতে ও সুখে-দুঃখে সবাই তাঁরই সাহায্য চায়। সব মানুষ প্রত্যেক মুহূর্তে, নিজের দ্বীন ও দুনিয়ার যাবতীয় বিষয়ে আল্লাহর সার্বক্ষণিক সাহায্যের মুখাপেক্ষী। আল্লাহর সাহায্য প্রার্থনা করা, তাঁর সন্তোষজনক কাজে তাঁর সহায়তা চাওয়া সবচেয়ে বেশি উপকারী দোয়া। মুসলমানের জিহ্বায় এ দোয়াটিই সবচেয়ে বেশি উচ্চারিত হয়। নামাজে এ দোয়ার উল্লেখ ছাড়া কোনো একটি রাকাতও সম্পূর্ণ হয় না। ‘আমরা তোমারই ইবাদত করি এবং তোমারই সাহায্য কামনা করি।’ (সূরা ফাতেহা : ৫)।
‘অক্ষমতা প্রকাশ করো না।’ কেননা অপারগতা প্রকাশকারী লোক নিজেকে স্থবিরতার মানসিকতায় আটকে রাখে, নিজের পদক্ষেপগুলোকে অলসতার অমূলক বিশ্বাসে আবদ্ধ করে রাখে। নিজের চিন্তাকে আশার মিথ্যা সুরের কাছে সমর্পণ করে দেয়। অক্ষমতা শয়তানের কাজকে সুগম করে দেয়। একথাটা সব অনিষ্টের চাবিকাঠি যখন সে বলে, ‘এমন এমন হলে আমি তা তা করতে পারতাম।’ অক্ষম লোকের পক্ষ থেকে দুঃশ্চিন্তা, ভীরুতা, কৃপণতা, ঋণগ্রস্ততা প্রকাশ পায়। এ জন্য নবী করিম (সা.) এর দোয়া এরকম ছিলÑ ‘হে আল্লাহ, আমি আপনার কাছে দুশ্চিন্তা, দুঃখ, অক্ষমতা, অলসতা, কৃপণতা, ভীরুতা, ঋণগ্রস্ততা ও লোকদের চাপ থেকে পানাহ চাচ্ছি।’
যে ব্যক্তি নিষ্ক্রিয় অক্ষমদের সঙ্গে বসে থাকে সমাজে তার কোনো মূল্য নেই। দেশে তার কোনো প্রভাব নেই। জাতির কাছে তার কোনো অবস্থান ও মর্যাদা নেই। যে কর্মহীন থাকে ও স্থবির থাকে সে মানবতা থেকে বিচ্যুত হয়ে পড়ে। যে অলসতায় অভ্যস্থ হয়, আরামের দিকে ঝুঁকে যায় সে শান্তি হারায়।
‘যা তোমার উপকারে আসবে তা অর্জনে আগ্রহী হও, আল্লাহর কাছে সাহায্য চাও এবং অক্ষমতা প্রকাশ করো না।’ এটি বিশাল মর্মবাহী একটি হাদিস। সংক্ষেপে এ হাদিসটি সফলতার সবগুলো পদক্ষেপের সমাবেশ ঘটিয়েছে। সুতরাং যে ব্যক্তি কল্যাণকর উপকারী কাজে আগ্রহী হবে, সচেষ্ট হবে, এর জন্য সব উপায় অবলম্বন করবে, তা অর্জন করতে ও সম্পূর্ণ করতে নিজের রবের কাছে সাহায্য চাইবে তখন এসব তার জন্য তৌফিক, সুযোগ ও প্রাপ্তি হবে। যখনই এ তিনটি জিনিসের একটির অভাব হবে তখন সেই অনুপাতে কল্যাণ থেকে সে বঞ্চিত হবে।
৫ জমাদিউল আউয়াল ১৪৪০ হিজরি মসজিদে নববির জুমার খুতবার সংক্ষিপ্ত ভাষান্তর মাহমুদুল হাসান জুনাইদ
