হৃদ্যতার সেতুবন্ধন সালাম
প্রকাশিত হয়েছে : ৪:০৯:২৩,অপরাহ্ন ০৬ মার্চ ২০১৯ | সংবাদটি ৪৬৪ বার পঠিত
ইসলামি বিধান মতে সাক্ষাৎকালে পরস্পরকে সালাম করা সুন্নত। এ সালাম কথা বলার আগেই দেওয়া উচিত। কারণ, সালামের আগে কথা শুরু করা ঠিক নয়। রাসুল (সা.) বলেন, ‘সালাম করতে হবে কথাবার্তা বলার আগেই।’ (তিরমিজি : ২৯১৬)
পরস্পর সাক্ষাৎকালে সালাম দেওয়া মহানবী হজরত মুহাম্মদ (সা.) এর সুন্নত। সালামের মাধ্যমে মুসলমানদের মাঝে পারস্পরিক শান্তি, রহমত ও বরকত কামনা করা হয়। প্রত্যেক ধর্মের অভিবাদন বাক্য ভিন্ন ভিন্ন হয়ে থাকে। যেমনÑ হিন্দু সম্প্রদায় নমস্কার, ইউরোপ-আমেরিকাসহ ইংরেজ জাতিরা গুডমর্নিং, গুড আফটারনুন, গুডনাইট ইত্যাদি ব্যবহার করে। আর মুসলিম জাতির অভিবাদনবাক্য হলো ইসলামি সালামÑ ‘আসসালামু আলাইকুম’। এর সঙ্গে ‘ওয়ারাহমাতুল্লাহি ওয়াবারাকাতুহ’ও যোগ করা যেতে পারে। সালামের ফজিলত সম্পর্কে কোরআন ও হাদিসের অসংখ্য বাণী রয়েছে।
কোরআনে সালামের নির্দেশ : পবিত্র কোরআনে সালাম প্রদান ও সালামের উত্তর উভয়টিকে বরকতময় বলা হয়েছে। এ প্রসঙ্গে আল্লাহ রাব্বুল আলামিন বলেন, ‘তোমাদের যখন সালাম বা অভিবাদন করা হয় তখন তোমরা তার জবাব আরও উত্তম ভাষায় দাও। নিঃসন্দেহে মহান আল্লাহ সর্ববিষয়ে হিসাব গ্রহণকারী।’ (সূরা নিসা : ৮৬)।
সালাম মোমিনের পবিত্র অধিকার : মুসলমানদের মাঝে পারস্পরিক বহু অধিকার রয়েছে। হাদিসে মুসলমানদের পারস্পরিক ছয়টি হক বা অধিকারের কথা বলা হয়েছে। এ অধিকারগুলোর মধ্যে সালাম অন্যতম। তাই মুসলমানদের উচিত সাক্ষাৎকালে সালাম বিনিময় করা। সালামের মাধ্যমে পরস্পরের শান্তি ও রহমত কামনা করা। শান্তির সমাজ বিনির্মাণে ইসলামি সালামের বিকল্প নেই। এ প্রসঙ্গে রাসুল (সা.) বলেন, ‘এক মোমিনের ওপর অপর মোমিনের ছয়টি হক রয়েছে, ১. যখন সে অসুস্থ হয় তার সেবা করা। ২. যখন মৃত্যুবরণ করে তার জানাজা ও দাফন-কাফনে উপস্থিত থাকা। ৩. যখন সে দাওয়াত দেয় তার দাওয়াত কবুল করা। ৪. যখন দেখা হয় সালাম করা। ৫. যখন হাঁচি দেয় তার উত্তর দেওয়া। ৬. উপস্থিত-অনুপস্থিত সব মোমিনের মঙ্গল কামনা করা।’ (নাসাঈ : ১৯৫০)।
গৃহবাসীকে সালাম করা সুন্নত : আমরা পরিবার-পরিজন নিয়ে গৃহে বসবাস করি। এ বসবাস সুখময় ও শান্তিময় হওয়ার জন্য পরিবারের মাঝে সালাম প্রচলন করা সুন্নত। সালামের মাধ্যমে পারিবারিক বন্ধন অটুট হয়। মানবগৃহ চির শান্তির আবাসস্থলে পরিণত হয়। এছাড়াও গৃহে আল্লাহর রহমত ও বরকত নাজিল হয়। তাই মুসলিম উম্মাহর উচিত যে কোনো গৃহে প্রবেশকালে বা বের হওয়ার সময় গৃহবাসীকে সালাম করা। এতে গৃহে অবস্থানরত জিন ও ফেরেশতাও সালাম পেতে পারে। এ প্রসঙ্গে রাসুল (সা.) বলেন, ‘যখন তোমরা কোনো গৃহে প্রবেশ করবে, গৃহবাসীকে সালাম করবে। আর যখন গৃহ থেকে বের হবে, তখন গৃহবাসীকে সালাম দিয়ে বিদায় গ্রহণ করবে।’ (বায়হাকি)। আরও বলেন, হে প্রিয় বৎস! যখন তুমি আপন পরিবার-পরিজনের কাছে যাবে তখন সালাম করবে। এই সালাম তোমার ও তোমার গৃহবাসীর জন্য বরকতের উপায় হবে। (তিরমিজি : ২৯১৫)।
আগে সালাম পরে কথা : ইসলামি বিধান মতে সাক্ষাৎকালে পরস্পরকে সালাম করা সুন্নত। এ সালাম কথা বলার আগেই দেওয়া উচিত। কারণ, সালামের আগে কথা শুরু করা ঠিক নয়। রাসুল (সা.) বলেন, ‘সালাম করতে হবে কথাবার্তা বলার আগেই।’ (তিরমিজি : ২৯১৬)।
সালাম করার নিয়ম : ইসলামি বিধানাবলি আমলের ক্ষেত্রে ইহুদি ও খ্রিষ্টানদের সঙ্গে পার্থক্য বজায় রেখে আমল করতে হবে। কারণ, ইসলামের অনেক বিষয়ে রাসুল (সা.) সরাসরি কাফেরদের বিরোধিতা করেছেন। যেমনÑ ইহুদিরা আশুরার রোজা একটি রাখে কিন্তু মুসলমানদের দুটি রোজা রাখার কথা বলা হয়েছে। একইভাবে সালামের ক্ষেত্রেও ইহুদি ও খ্রিষ্টানদের সাদৃৃশ্য অবলম্বন করা থেকে বিরত থাকতে হবে। তারা হাত ও আঙুলের ইশারায় সালাম করে। এছাড়াও অনেককে হাত জোড় করে, কোমর বা মাথা ঝুঁকিয়ে সালাম করতে দেখা যায়। সালামের এসব পদ্ধতি ইসলামি শরিয়তের পরিপন্থি। কিন্তু মুসলিম উম্মাহ সালাম করার সময় হাত ও আঙুল ওঠানোসহ উল্লেখিত পন্থাগুলোর কোনো একটি অবলম্বন করবে না, বরং হাত না তুলে সালাম করবে। এ প্রসঙ্গে রাসুল (সা.) বলেন, ‘যে ব্যক্তি তোমাদের ছাড়া অন্য জাতির সঙ্গে সাদৃশ্য রাখে সে আমাদের দলের নয়। তোমরা ইহুদি ও খ্রিষ্টানদের সঙ্গে সাদৃশ্য করো না। কেননা, ইহুদিরা আঙুলের ইশারায় সালাম করে আর খ্রিষ্টানরা হাতের তালুর দ্বারা সালাম করে।’ (তিরমিজি : ২৯১১)।
সালাম পারস্পরিক হৃদ্যতা বৃদ্ধির অনন্য উপায় : সালামের মাধ্যমে মোমিনদের পারস্পরিক ভালোবাসা বৃদ্ধি পায়। সালাম মানুষের মুখে হাসি ফোটাতে পারে। উদ্বিগ্ন মনকে পুলকিত করতে পারে। সালাম মানবজাতির হৃদ্যতার প্রতীক। তাই মুসলিম উম্মাহর উচিত সালামের প্রচলন বেশি পরিমাণে করা। সাক্ষাতে একে অপরকে সালাম করা। ইসলামি অভিবাদন সালামই হচ্ছে পারস্পরিক ভালোবাসা ও হৃদ্যতা বৃদ্ধির অনন্য উপায়। এ প্রসঙ্গে রাসুল (সা.) বলেন, ‘তোমরা বেহেশতে প্রবেশ করতে পারবে না, যতক্ষণ না তোমরা ঈমান গ্রহণ করবে। আর ততক্ষণ পর্যন্ত ঈমান গ্রহণ হবে না, যতক্ষণ না তোমরা পরস্পরকে ভালোবাসবে। আমি কি তোমাদের এমন কথা বলে দেব, যার ওপর আমল করলে তোমাদের পারস্পরিক ভালোবাসা বৃদ্ধি পাবে? তোমরা সালামের বেশি বেশি প্রচলন করো।’ (মুসলিম : ২০৩)।
প্রথমে সালাম প্রদানকারী ব্যক্তি আল্লাহর নৈকট্য লাভে ধন্য হয় : পরস্পরে সাক্ষাৎকালে প্রথমে সালাম প্রদানকারী আল্লাহর নৈকট্য লাভে ধন্য হয়। কিন্তু আমাদের সমাজে অনেককে দেখা যায়Ñ অপরের সালামের অপেক্ষায় মুখের দিকে তাকিয়ে থাকে। তারা মনে করে আগে সালাম প্রদানে মানহানি হয়। অথচ নবীজি (সা.) সাহাবাদের সঙ্গে সাক্ষাৎকালে নিজেই প্রথমে সালাম দিতেন। প্রথমে সালাম করার মধ্যে বিনয় ও ভদ্রতা নিহিত রয়েছে। এছাড়াও আগে সালাম করার মাধ্যমে স্বীয় আত্ম অহংকার লোপ পায়। এ প্রসঙ্গে রাসুল (সা.) বলেন, ‘আগে সালাম প্রদানকারী অহংকার থেকে মুক্ত।’ (বায়হাকি)। তিনি আরও বলেন, ‘সেই ব্যক্তিই আল্লাহ তায়ালার অধিক নিকটবর্তী যে প্রথমে সালাম করে।’ (আবু দাউদ : ৫১৯৯)।
