কওমি মাদ্রাসার নতুন শিক্ষাবর্ষ শুরু, আগামীর পথচলা সুন্দর ও সার্থক হোক
প্রকাশিত হয়েছে : ২:৫৬:৫১,অপরাহ্ন ০১ জুলাই ২০১৯ | সংবাদটি ৩০৮ বার পঠিত
রেওয়াজ মাফিক প্রতি বছর হিজরি সনের শাওয়াল থেকে বাংলাদেশসহ গোটা উপমহাদেশে কওমি মাদ্রাসার নতুন শিক্ষাবর্ষ শুরু হয়। যারা ফারিগ হন তারা অন্য কোনো দ্বীনি প্রতিষ্ঠানে অথবা অন্য কোনো হালাল পেশায় যোগ দিয়ে কর্মজীবন শুরু করেন। নতুন শিক্ষার্থীরা পছন্দের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে বিভিন্ন স্তরে ভর্তি হয়ে নবউদ্যমে তালিম গ্রহণ করেন। ভারতের দারুল উলুম দেওবন্দ প্রণীত অষ্টনীতিমালা (উসুলে হাশতগানা), কারিকুলাম ও কার্যপ্রণালি মতে সারা দুনিয়ার কওমি মাদ্রাসা পরিচালিত হয়। দারসে নিজামি এই শিক্ষাব্যবস্থার ভিত্তি। কওমি মাদ্রাসার শিক্ষাব্যবস্থা আবাসিক। এখানে শিক্ষার সঙ্গে আছে দীক্ষা, তালিমের পাশাপাশি আছে তারবিয়ত। পুরো দিন-রাত রুটিন মাফিক পরিচালিত হয়। নির্ধারিত সময়ে নামাজ, শয্যাত্যাগ, শয্যাগ্রহণ, নাশতা, গোসল, খাবার, সবকে অংশগ্রহণ, কুতুবখানায় অধ্যয়ন, খেলাধুলা প্রভৃতি নির্দিষ্ট ওস্তাদের তত্ত্বাবধানে পরিচালিত হয়। কওমি মাদ্রাসার শিক্ষাব্যবস্থার উল্লেখযোগ্য বৈশিষ্ট্য হচ্ছে ‘তাকরার’। ইংরেজিতে যাকে বলা হয় এৎড়ঁঢ় ঝঃঁফু (সামষ্টিক পাঠ)। ২০-৩০ জন অথবা কমবেশি ছাত্র গ্রুপ করে মাগরিবের পর মাদ্রাসার বারান্দায় অথবা হলে বসে দিনের বেলা ক্লাসে ওস্তাদপ্রদত্ত সবকের খুঁটিনাটি বিষয় নিয়ে আলোচনা করে। প্রতিটি গ্রুপে একজন মেধাবী ছাত্র গ্রুপ লিডার হিসেবে থাকে। পুরো ব্যবস্থার নিয়ন্ত্রণে থাকেন একজন ওস্তাদ। মাদ্রাসা বোর্ডিংয়ে যেসব শিক্ষার্থী থাকে তাদের দেখভালের জন্য আছেন একজন তত্ত্বাবধায়ক। তিনি নাজিম দারুত তালাবা নামে পরিচিত। শিক্ষা কার্যক্রম ও খাবারের জিম্মাদাররা যথাক্রমে নাজিম তালিমাত ও নাজিম মাতবাখ নামে খ্যাত। এসব জিম্মাদার মুহতামিমের কাছে দায়াবদ্ধ। ছাত্ররাজনীতি না থাকায় কওমি মাদ্রাসার পরিবেশ একান্ত শিক্ষাবান্ধব।
নতুন শিক্ষাবর্ষে যারা মাদ্রাসায় দাখিলা নিয়েছে আমরা তাদের স্বাগত জানাই। বস্তুবাদী এ দুনিয়ায় পবিত্র কোরআন, হাদিস ও ফিকহে ইসলামির ইলম অর্জন করে আমলের মাধ্যমে জীবন পরিবর্তন করতে পারলে আল্লাহ তায়ালার রেজামন্দি হাসিল হবে এবং জীবন হবে স্বার্থক ও সুখময়। নিজের, পরিবারের, সমাজের ও রাষ্ট্রের প্রতি আমাদের দায়িত্ব ও কর্তব্য রয়েছে। শিক্ষার্থীদের মনে রাখতে হবেÑ
১. বিনাশ্রমে কিছু পাওয়া যায় না। যে যত বেশি মেহনতি সে তত বেশি সফল। দৈনন্দিন কাজেন রুটিন তৈরি করে সে মাফিক চলতে হবে। ছাত্রজীবন কাজে লাগাতে না পারলে, কর্মজীবনে আর সুযোগ আসবে না। ইলমে দ্বীন আহরণ ও বিতরণে ব্যস্ত থাকার কারণে পৃথিবীর বহু আলেম বিয়ে পর্যন্ত করেননি। বিশ্বখ্যাত সিরিয়ার হানাফি আলেম শায়খ অবদুল ফাত্তাহ আবু গুদ্দাহ (রহ.) এ বিষয়ে একটি কিতাব লেখেন, যার নাম ‘আল উলামাউল উয্যাব’।
২. তালিবে ইলমদের সময় কাজে লাগাতে হবে। প্রতিটি নিঃশ্বাস মূল্যবান। সময়ের আয়তন কম, জীবনের পরিধি সীমিত। হেলায় ফেলায় সময় নষ্ট করে দিলে জীবন উচ্ছন্ন হয়ে যাবে, ব্যর্থতা আমৃত্যু যাতনা দেবে। পৃথিবীর সফল ব্যক্তিরা সময়কে কাজে লাগিয়েছেন। আকাবেরিনে দেওবন্দ তার উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত।
৩. নাহু, সারাফ, ইনশা তথা আরবি ভাষা ও সাহিত্যের ওপর সবিশেষ জোর দিতে হবে। ইলমে দ্বীনের বুনিয়াদ আরবির ওপর। তাফাসির, শারুহাতে হাদিস, ফিকহের সব কিতাব আরবি। আরবি ভাষায় পারঙ্গমতা থাকলে মূল কিতাব থেকে উপকৃত হওয়া যাবে।
৪. ওস্তাদের সঙ্গে সুসম্পর্ক বজায় রাখতে হবে। যেসব ওস্তাদের সঙ্গে কোনো স্বীকৃত বুজুর্গের নিসবত আছে তাদের খেদমত করতে হবে। ওস্তাদের নেক নজরের বরকতে শিক্ষার্থীদের জীবনে ইতিবাচক মৌলিক পরিবর্তন আসবে।
৫. বাংলা আমাদের মাতৃভাষা। ভাষাকে অবজ্ঞা করা যাবে না। এ ভাষায় আলেমদের তালিম, লেখালেখি, দাওয়াত-তাবলিগ, ওয়াজ-নসিহত করতে হবে। তাই বাংলা ভাষা শিক্ষা ও চর্চায় ছাত্রদের সচেতন থাকতে হবে।
৬. মাদ্রাসার রেওয়াজ, শর্ত, নিয়ম-কানুনের প্রতি যতœবান থাকতে হবে।
৭. মাদ্রাসায় অবস্থানকালীন মোবাইল, ফেইসবুক, টুইটার, ইনস্টাগ্রাম ও নেট পরিচালনা বন্ধ রাখতে হবে। ছুটিতে বাড়িতে অবস্থানকালীন মোবাইল ও ফেইসবুক সীমিত রাখতে হবে। বিশেষজ্ঞদের মতে, ফেইসবুকের আসক্তি কোকেন নামক মাদকের চেয়েও বেশি।
৮. সর্বদা সুন্নতের পায়রবি করতে হবে। বেদাত ও পাপ থেকে বিরত থাকতে হবে। মাদ্রাসার অভ্যন্তরে নেককার ছেলেদের সঙ্গে মিশতে হবে। চরিত্রে ঘাটতি আছে, এমন ছেলে থেকে সযতেœ দূরে থাকতে হবে। মনে রাখতে হবে ইলম আল্লাহ তায়ালার নুর। আল্লাহ তায়ালা গোনাহগারকে ইলম দান করেন না। দয়া করে ইলম দান করলেও ‘ইফাদিয়ত’ কেড়ে (সালাব) নেন। সমাজে এ রকম নজির ভূরি ভূরি।
নতুন বছরে শিক্ষার্থীদের জীবন ফলে-ফুলে ভরে উঠুক। যোগ্য ও দক্ষ আলেম হিসেবে তারা গড়ে উঠুক। ব্যক্তি, সমাজ ও রাষ্ট্রে পরিবর্তন আসুক। আল্লাহ তায়ালার দরবারে এটাই প্রার্থনা।
