গুজবে কান না দিয়ে সচেতন হতে হবে
প্রকাশিত হয়েছে : ১০:৪৯:৩১,অপরাহ্ন ২৬ জুলাই ২০১৯ | সংবাদটি ৩৩২ বার পঠিত
সাইফুর রহমান
আজ বিদ্যালয় থেকে বেরিয়ে আসার সময় শাহগলী বাসস্ট্যান্ডে একজন অপরিচিত ৭৫/৮০ বছর এর বৃদ্ধ মানুষের সাথে দেখা হল। ইতিপূর্বে আমি কোনদিন দেখিনি তাঁকে। আমার দিকে চেয়ে আছেন বুঝতে পেরে একটু সামন দিয়ে আগাইলে আমাকে দেখে কি জেনে বলবেন বলবেন ভাব বুঝতে পারলাম। আমি বললাম দাদা কিছু বলবেন। প্রথমে কিছুই না বলে দুই তিনবার বলার পর হাত দিয়ে চোখের পানি মুছে কিছু বলতে চাইলেন। কিন্তু মুখ দিয়ে কথা বের হচ্ছেনা। আমি বুঝতে পারলাম হয়তো পেটের খিদের কারণে কথা বের হচ্ছেনা। তখন আমি একটা কেক ও জুস এনে দিয়ে বললাম দাদা এটা খান। খুব খুশি হয়ে সামান্য সময়ের মধ্যে খেয়ে ফেললেন। কেক ও জুস খাওয়ার পর বুঝলাম এখন কিছু জিজ্ঞেস করলে হয়তো কিছু বলবেন। পরিচয় জানতে গিয়ে তিনি বললেন,নদী ভাঙ্গনে বাড়ীঘর সবকিছু বিলিন হওয়াতে স্ত্রীকে নিয়ে এসেছেন সিলেটে। থাকেন সিলেট একটি কলোনিতে। দুই ছেলে তাদের ফেলে শশুর বাড়ী চলে গেছে। একদিনও খুজ নেনি বাড়ীতে থাকা অবস্থায়। অসহায় অবস্থায় সিলেট চলে এসেছেন বাকী জীবন ভিক্ষা করে হলেও স্ত্রীকে নিয়ে বেঁচে থাকবেন। আজ এখানে কেন এসেছেন? জানতে গিয়ে তিনি বলেন,প্রতিদিন বিভিন্ন গ্রাম থেকে ভিক্ষা করে যা পাইতাম তা দিয়ে আমরা দুজনের কোনমতে চলা যেত। কয়েকদিন আগে একটি গ্রামে ভিক্ষা করতে গেলে কল্লা কাটরা(কুছুধরা) ভেবে আমাকে কিছু মানুষ ধরে ফেলে। কয়েকজন যুবক আমাকে মারতেও থাকে। আমি অনেক কান্নাকাটি করে তাদের কাছ থেকে ছুটে আসি। দুই/ তিন দিন থেকে ঘরে কিছুই নেই। আজ বের হয়েছিলাম ভিক্ষা করে ঘরে কিছু নিয়ে যাব। যখন গতদিনের মারের কথা মনে হল তখন ভিক্ষা করতে যেতে মন চাইল না। সেজন্য এখানে গাড়ী থেকে নেমে গেলাম। সকাল থেকে কিছু খাইনি বলে শরীর খুব খারাপ করেছিল। মনে হয়েছিল হয়তো আজ আমি মরে যাব। কিন্তু তুমি আমাকে কিছু খাওয়ানোর জন্য মনে হচ্ছে আল্লাহ আমাকে মৃত্যুর কাছ থেকে ফিরে এনেছেন। বৃদ্ধ মানুষের কথা শুনে আমার চোখের পানি ধরে রাখতে পারলাম না। হাত দিয়ে আমার চোখের পানি মুছে পকেট থেকে সামান্য টাকা দিয়ে বিদায় করে দিলাম। বৃদ্ধ মানুষটি হাটছে আর আমি মনেমনে চিন্তা করতে লাগলাম। কিছু কুচক্রিমহল দেশের মধ্যে মিথ্যা বানোয়াট একটা আতংক সৃস্টি করেছে। আর এই গুজবের কারনে অনেক নিরিহ মানুষদের পিটিয়ে হত্যা করা হচ্ছে।অনেকে ভালো সম্মানি মানুষকে কল্লা কাটরা ভেবে অপমান করা হচ্ছে।অনেক মানুষ দূরদূরান্তে আত্মীয়ের বাড়ীতে যাওয়া বন্ধ করে দিয়েছে।ভিক্ষুকরা জানের ভয়ে ভিক্ষা করতে যাচ্ছেনা, এতে দিনের পর দিন না খেয়ে অতিবাহিত করছে।শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে শিক্ষার্থীরা যাওয়া বন্ধ করে দিতেছে। সর্বোপরি, দেশের মধ্যে একটা আতংক সৃস্টির মাধ্যমে বিভিন্নভাবে দেশের ক্ষতি হচ্ছে। শেষ কথা হচ্ছেঃআজ পর্যন্ত নিজের চোখে কেউ কি? দেখেছেন কোথায় কল্লা কাটা কাউকে। যাকে জিজ্ঞেস করবেন,শুধু বলবে অমুক তমুকের কাছ থেকে শুনেছি। আমি বলব,কল্লা কাটা একটা গুজব ছাড়া আর কিছুই নয়। আমরা এই গুজবে কান দিয়ে কখনও যেন নিজের হাতে আইন তুলে না নেই। কোন ব্যক্তিকে সন্দেহ হলে প্রশাসনের লোকদের খবর দেই। মনে রাখবেন আমাদের একটি ভুলের কারণে হয়তো একটা সুন্দর পরিবারের স্বপ্ন ভেঙ্গে চুরমার হয়ে যেতে পারে। তাই গুজবে কান না দিয়ে সচেতন হতে হবে।
লেখক, প্রিন্সিপাল,শাহগলী আদর্শ শিশু বিদ্যানিকেতন। যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক,বাংলাদেশ মানবাধিকার কমিশন সিলেট জেলা।
